আলমগীর কবীর :
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে আন্দোলনের সময় শত শত কারাবন্দির পলায়নের হদিস নেই এখনো।জেল পলাতক বন্দিদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, হত্যা, অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ একাধিক অভিযোগে ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে দুর্র্ধষরা আবারো নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার আশঙ্কা রয়েছে। যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে গত আগস্ট ২০২৪ইং সালে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আর জেল ভেঙে পালিয়ে তারা আরো বেশি অপরাধ করার সুযোগ পেয়েছে। দেশে চলমান খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোর পেছনেও পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পালানো ওসব বন্দিকে আইনের আওতায় আনা গেলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়ার শঙ্কা থাকে। কারা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো ৭১৩ জন ফেরারি আসামী। ওসব বন্দির মধ্যে দুর্র্ধষ অপরাধীও রয়েছে। পাশাপাশি দেড় বছর হতে চললেও এখনো কারাগার থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। ওসব অস্ত্রের মধ্যে আছে চাইনিজ রাইফেল, শটগানও। ওই অস্ত্র ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পলাতক বন্দিদের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের সব বন্দি পালিয়ে যায়। তার মধ্যে নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬ জন, শেরপুর থেকে ৫০০ জন, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০ জন, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ জন ও কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ বন্দি পালিয়ে যায়। তার বাইরে জামালপুর কারাগারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখান থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
উল্লেখ্য সেই সময়ে দেশের কারাগার থেকে ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যায়। পরে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফেরানো সম্ভব হলেও এখনো ৭১৩ জন ফেরারি। পাশাপাশি ওই সময় দেশের কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি অস্ত্র লুট হয়। তার মধ্যে এখনো ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। যা মোট লুট হওয়া অস্ত্রের ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিগত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সর্বপ্রথম নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে সেলের তালা ভেঙে দেয়। তাতে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৯ জনসহ মোট ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যায়।
তখন অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্যপণ্য লুট এবং ব্যাপক ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে কারা কর্তৃপক্ষ ও রক্ষীরা প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও অবস্থা বেগতিক দেখে শেষ পর্যন- পিছু হটতে বাধ্য হয়। দেশের কারাগারগুলোর মধ্যে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারকে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি সংবলিত কারাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত ওই কারাগারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, একাধিক গুরুতর অপরাধে ও জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসে জড়িত দুর্র্ধষ বন্দিদের রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিকালে কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে থাকা বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ওই সময় তারা কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কারারক্ষীরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাদের ওপর বন্দিরা চড়াও হয়।
কারারক্ষীদের মারধর করে বন্দিদের কেউ দেয়াল ভেঙে, কেউ টপকে, আবার কেউ দেয়ালের সঙ্গে বিদ্যুতের পাইপ লাগিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বন্দিদের মধ্যে ২০৯ জন দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর পালানোর সময় নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে ৬ জনের মৃত্যু হয়। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের পর জামালপুর কারাগারে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। ৮ আগস্ট বেলা দেড়টার দিকে কারাগারের কিছু কয়েদি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মারামারি শুরু করে। পরে ১৩ কারারক্ষীকে জিম্মি ও মারধর করে কারাগারের ভেতরের ফটক ভেঙে পালানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারারক্ষীরা গুলি ছুড়লে ৬ জন নিহত হয়।
এদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগার থেকে যেসব বন্দি পালিয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিলেন। তারা খুব সহজ প্রকৃতির অপরাধী না। ঐসব অপরাধী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বা কারো হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াতে পারে। কারণ তাদের সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে কাজ করে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা জরুরি।
অন্যদিকে এ বিষয়ে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের ১৭টি কারাগার বিশৃঙ্খলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আর পলাতক বন্দিদের ধরতে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো যাদের ফেরানো যায়নি তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।